০৬ জানুয়ারী, ২০১০
......। জীবন! কত বড়
একটা সুযোগ! একবার গেল তো চিরকালই গেল, আর কখনোই তা আবার ফিরে পাবার সুযোগ নেই।
যতই ধর্মগ্রন্থগুলো বলে থাকুক মৃত্যুর পরের অন্য জীবনের কথা, তা তো আর জীবন নয়!
জীবন মানে স্মৃতি। আমি ভেবে পাইনা কোন মানুষ তার সারাজীবনের স্মৃতি নিয়ে কীভাবে
স্বর্গ বা নরকে স্থির থাকতে পারে। সে স্বর্গ যত ভালই হোক, আনন্দদায়ক হোক মানুষ তার
অতীতের কথা, প্রিয়মুখের কথা স্মরণ করবেই। এটা মানুষের মৌলিক একটা বৈশিষ্ট্য। তাহলে
সে সুখ মিথ্যা। আর যদি ধরে নেয়া হয় যে তখন মানুষের পৃথিবীর সব স্মৃতি মুছে দেয়া
হবে তাহলে আর আমার আমিত্ব কোথায় থাকল? আমার সম্পূর্ণ স্বরূপের কেন্দ্রবিন্দুই তো
হল আমার স্মৃতি। এটি নেই তো অন্য অনেক মানুষের সাথে আমার পার্থক্যও নেই। ফলে
মৃত্যুর পর শান্তি পাব এমন কোন সুখচিন্তাও আমাকে শান্তি দেয় না। মৃত্যুকে আমি দেখি
সকল অস্তিত্বের একটি সমাপ্তি রূপে। তারপর কী, বা আদৌ বা কিছু থাকা সম্ভব কিনা তা
আমি জানি না, জানা সম্ভবও না। তবে এটা নিশ্চিত যে তা প্রচলিত ধর্মবিশ্বাসগুলোকে
সমর্থন করবে না।
লেখায় বাধা পড়ল। (....)
ফোন দিয়েছিল। প্রায় বিশ মিনিট কথা বললাম। মানুষ কত সহজ, সাধারণ হতে পারে। নিশ্চয়ই
তাদের প্রতি মুহুর্তে চিন্তার ঝড় মোকাবেলা করতে হয় না। কেন তাহলে এত ধরনের চিন্তা
আমার মাথায় আসে? কেন এই পৃথিবীর ব্যাবস্থাকে, মানুষের জীবন ব্যাবস্থাকে আমি
কিছুতেই মেনে নিতে পারি না? এত জ্ঞান, এত স্মৃতি, এত আবেগ, এত কিছু তবু কী সীমিতই
তার ব্যাপ্তিকাল! জীবনটাকে পুরো বুঝে উঠতে না উঠতেই যদি তা শেষ হয়ে যায়, তার কি
কোন অর্থ হয়? কোনই অর্থ হয় না।
১৭ই ফেব্রুয়ারী, ২০১০
অনেক পছন্দ করে
ডায়েরীখানা কিনেছিলাম নিজের সুখ-দুঃখের কথাগুলো লিখে রাখব বলে। যাতে অনেকদিন পরে
জীবনটাকে একবার ফিরে দেখতে গিয়ে অনুভূতিগুলো বুঝতে অসুবিধা না হয়। তবে মনে হচ্ছে
এই ডায়েরীতে আমি আনন্দের, সুখের, শান্তির কোন Event এর কথা লিখতে
পারব না। দিনগুলো সব একইরকম নিরানন্দ, একঘেয়ে এবং আশঙ্কায় পরিপূর্ণ। আজ বের
হয়েছিলাম সকালে। কল করে সেতু, নাইম, বিষাণ ও শোভনকে ডাকলাম। কাল রাতের সামান্য ঝড়-বৃষ্টির
পর এখনও আকাশ পরিষ্কার হয়নি। আমি সাইবার ক্যাফেতে বসে কাজ করছিলাম। ওরা যখন এল
ততক্ষণে আবার বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। বিষাণ, শোভন আগেই এসেছিল, সেতু আর নাইম এল
ভিজতে ভিজতে। ওরা কত প্রাণবন্ত, কত উচ্ছল, কত tension free! কত সহজে ওরা
মজা করতে পারে, মজা পেতে পারে। জীবনের উপর কালো অন্ধকার মেঘ স্থির হয়ে নেই ওদের
কারোর। কারেন্ট চলে গেল, আমরা পাঁচজন বাইরে এসে দাঁড়ালাম। ঝিরঝিরে বৃষ্টি হচ্ছে।
হালকা বাতাস। আমার অসম্ভব প্রিয় আবহাওয়া। কিন্তু আমি উপভোগ করতে পারছি না। কিছুই
যেন শান্তি দিচ্ছে না। আমার প্রিয় বন্ধুরা পাশে রয়েছে, এত সুন্দর আবহাওয়া তবু এক
মুহূর্তও ওখানে থাকতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। এক ছুটে গিয়ে হারিয়ে যেতে ইচ্ছা করছিল
কোথাও, কোন নির্জন নিভৃত কোণে।
২১ এপ্রিল, ২০১০
প্রস্তাবনাঃ
মানুষ ডায়েরী লেখে কেন?
প্রশ্নটা আপাতভাবে খুব সরল হলেও উত্তরটা কিছুটা কঠিন। কারণ ডায়েরী মানুষের
ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিচ্ছবি। ফলে ডায়েরী লেখার পেছনে একেকজনের একেকরকম মনস্তত্ব
কাজ করে। তবে এটা ঠিক ডায়েরী সম্পর্কে কিছুটা গোপনীয়তা সবাই চায়। আমিও চাই। এই
ডায়েরীতে আমি চেষ্টা করব যতটা সম্ভব নিজের কাছে পরিষ্কার থেকে নিজেকে তুলে ধরতে।
যাতে বহুদিন পরে যদি কোন এক ফাঁকে ডায়েরীখানায় আঙুল বুলাই তাহলে নিজের এই সময়টাতে
ফিরে আসতে পারি। সেই অনাগত আমার উদ্দেশ্যেই ডায়েরীখানা হওয়ার কথা ছিল। তবে কি, আমি
যখন যাই লিখি না কেন কোন এক অজানা পাঠককে কল্পনা করেই লিখি। যখন ডায়েরী লিখি তখনও
মনে হয় আমি ছাড়াও হয়তো কোন একদিন কেউ লেখাটা পড়বে। ফলে নিজের অজান্তেই লেখাটা তার
জন্যই হয়ে যায়। এই ডায়েরীখানা আমি খুব শখ করে কিনেছিলাম, তাই স্বভাবতই আমি চাইব এর
প্রতিটি পাতাই আমার কাজে লাগুক। তাই এখন থেকে লেখাগুলো হবে পরপর, তারিখ অনুযায়ী
পৃষ্ঠায় নয়। আর এখন পর্যন্ত মাঝে যে ফাঁকা জায়গাগুলো আছে সেটা ভরাট করা হবে
“স্বপ্নজগৎ” দিয়ে। এখানে ঠাই পাবে আমার রাতের বেলার সেইসব স্বপ্ন যা যথেষ্ট
পরিষ্কার ও মনের উপর প্রভাববিস্তারী।
তবে একটা কথা, স্বপ্ন
নিতান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার। এমনিতেই এর বেশিরভাগ অংশই তেমন মনে থাকে না, তারপর
আবার এমনভাবে সব দেখা যায় এবং এমনকিছু দেখা যায় যা বর্ননা করে কাউকে বোঝানো খুবই
কঠিন। সেক্ষেত্রে পরবর্তীতে কেউ যদি কোনদিন এই ডায়েরী পড়েও, তাহলে বেশি একটা
সুবিধা করতে পারবে না। তবে আশার কথা স্মৃতিগুলি যেহেতু আমার, তাই বর্ননা পড়ে হয়ত
বহুদিন পরে আবার মনে করতে পারব। সামান্য হলেও, একটা ভয় কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। যেসব
স্বপ্নের কথা আমি ভুলে যেতে চাই, সেগুলোকে লিপিবদ্ধ করে বাঁচিয়ে রাখা ঠিক হবে কিনা
বুঝতে পারছি না।
৫ই জানুয়ারী, ২০১১
বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য কী? কেন
মানুষকে বেঁচে থাকতে হয়? মানুষ নিজেকে খুব ভালবাসে বলেই
কি জীবনকে হারাতে এত ভয়? হ্যাঁ জানি জীবন অনেক বড় একটা
সুযোগ, একে একবার হারালে পাওয়ার আর কোন উপায়ই থাকে না,
কিন্তু মানুষ জন্মায় কেন? প্রাকৃতিক
প্রক্রিয়ার বাইরে মানুষের জন্মের কি আলাদা কোন সার্থকতা থাকা সম্ভব? কেননা জন্মস্থানের সাথে সাথে কী বিস্তর ফারাকই না তৈরি হচ্ছে জীবনধারায়।
কোথায় যান্ত্রিক শহরের কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে হৈ হুল্লোড়
করে করে বেড়ানো ফ্যাশনে ডুবে থাকা আর হাজারটা রিলেশনের জালে জড়িয়ে থাকা তরুণ আর কোথায়
সমুদ্র ও পাহাড়ের গা ঘেঁষে গড়ে ওঠা জনপদের কোন আদিবাসী তরুণ, যে হয়তো প্রায় শূন্যের কাছাকাছি বসে পুরো দিগন্তটাকে চোখের সামনে নিয়ে
লক্ষ বছরের পুরোনো কোন পাথরে ঠেস দিয়ে একমনে হাড়ের বাঁশি বাজায়। তাদের দুইজনের চিন্তাধারা
কি কখনও এক হবে? তাহলে তাদের জন্য সার্থকতা কে নির্ধারন
করে দেবে? আসলে আমার মতে পৃথিবীতে যতগুলো মানুষ, ঠিক ততগুলোই সার্থকতা। আমরা শুধু সমাজের ঠিক করে দেওয়া সার্থক
মানুষগুলোকে অনুকরণ করতে করতে নিজেদের সার্থকতা খুঁজি। কিন্তু যাদের আমরা সার্থক
বলে ধরে নিই, তারা নিজেরা কি তাদের নিজেদের জীবন নিয়ে
সন্তুষ্ট বা তাঁদের জীবনধারাই কি সবার জন্য অনুকরণীয়? মানুষকে
ব্যক্তিক দৃষ্টিতে দেখা উচিৎ, সামষ্টিকভাবে নয়। কোন
মানুষের কোন অবস্থাকেই ব্যক্তি নিজে ছাড়া সফল-অসফলের নিরিখে অন্য কারও বিচার করতে
পারা উচিৎ নয়। আমরা আসলে খুব সহজে সাধারণীকরণ করে ফেলি মানুষকে। আমার কথাই ধরা যাক,
আমি যে আপাত দৃষ্টিতে সমাজের চোখে ব্যার্থ একটা ছেলে, এটি কে নির্ধারন করেছে? সমাজ। সমাজ যদি
নির্ধারন করে না দিত তাহলে ব্যক্তিগত জীবনে আমি এত সহজে এই অবস্থাকে ব্যার্থতা বলে
মেনে নিতাম? সমাজকে এই নির্ধারন করে দেওয়ার দায়িত্ব থেকে
সরে আসতে হবে। মানুষকে বিচার করার মত পূর্ণাঙ্গতা এখনও সমাজ পায়নি এবং সমাজের এই
বিচার না করতে যাওয়াটাই শ্রেয়। আসলে সবার জীবনটাকে একই নিয়মের মধ্যে ফেলতে চাওয়ার সমাজের
যে ব্যবস্থা, তা মানুষের ক্ষুদ্র জীবনটাকে খুব দ্রুত এবং ‘আগে থেকেই জানা উপায়ে’ পার করিয়ে দিচ্ছে।
বেশিরভাগ মানুষ এটা বুঝতেও পারে না আর এটাকেই স্বাভাবিক বলে ধরে নিয়েছে। ভাল লাগে
না কিছুই। নানারকম চিন্তা মাথায় যায় আসে, তাতে লাভ হয়না
কিছুই। সময়গুলো যে কত দ্রুত পার হয়ে যাচ্ছে তা নিজেই অবাক হয়ে দেখছি। একইভাবে রোজ
ঘুম থেকে উঠছি, চোখের পলকে দিনটা পার হয়ে যাচ্ছে আর
নিজেকে ফিরে পাচ্ছি বিছানায়। করার আছে অনেক অনেক কিছু তবু সারাদিন-রাত কোনকিছুই
আমি করতে পারি না। কী অসহ্য!
