২০ ডিসেম্বর, ২০১৪

সান্ধ্যভ্রমণ

ঢাকায় আসার পর আমি প্রায় পুরোপুরি ঘরকুনো হয়ে গেছি। নিতান্তই বাইরে যেতে না হলে আমি পারতপক্ষে রাস্তায় নামি না। কেন সেটার কারণ আমার কাছে স্পষ্ট, তাই সেটা নিয়ে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। বসুন্ধরা এলাকাটাই মোটামুটি আমার নির্বাসনের জেলখানার সীমা। অথচ নিজের জেলা শহরে এর উলটোটাই ছিলাম। পুরো শহর প্রায় চষে বেড়াতাম আর প্রচুর হাঁটতাম। কিলোমিটারের পর কিলোমিটার হেটে গেছি যেদিন যেদিকে যেতে ইচ্ছে হয়েছে। আজকে আমেরিকান ছাত্রটির সাথে বাংলা চর্চা শেষ করে বের হয়ে কেন জানি বাসায় ফিরতে ইচ্ছা হল না। ছয়টা বাজে। ছুটির দিনের সন্ধ্যায় রাস্তাঘাট গমগম করছে মানুষের চলাচলে। আমিও মিশে গেলাম জনস্রোতে। অনেকদিন পর আবার মনে হল, কয়েকঘন্টা হেটে দেখা যাক। যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে গিয়ে দেখি মানুষ উৎসবমুখর পরিবেশে ভিতরে ঢুকছে। একসাথে এত কিছিমের মানুষ দেখার লোভে আমিও স্রোতের সাথে ঢুকে পড়লাম। ফিউচার পার্ক আমার কাছে এখনও যথেষ্ট গোলকধাঁধা। একদিক দিয়ে গিয়ে ঘুরে আবার সেদিকেই ফিরে আসি। আর আমার তাতে আপত্তিও নেই কারণ আমার তো কোন উদ্দেশ্য নেই, আমি তো কিছু খুঁজছি না। একদম উচ্চবিত্তের কপিরাইট করা শোরুমগুলো বাদ দিলাম। কারণ ওখানে মধ্যবিত্ত খুব বেশী ঢোকে না। তাই বৈচিত্র্যও কম। অনেকটা কাঁচে ঘেরা প্রাণহীন নিশ্চল শোকেসের মত। কাপড়ের দোকানও বাদ দিলাম, ওদিকে আমার তেমন আগ্রহ নেই। প্রথমেই ঢুকলাম আড়ঙে, অনেকরকম জিনিসপাতি সেখানে তাই ক্রেতাদের বিস্তারও অনেক বেশী। মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত সবাইই সেখানে আছেন। যাদের একটু বাজেট কম তারা মুখচোখ শক্ত করে জিনিসপত্র দেখছেন। তাদের মুখ একটু তুলনামুলক বেশী সিরিয়াস ভারী পকেটওয়ালাদের থেকে। সেলসম্যান যাতে তাদেরকে একটু গুরুত্বপূর্ণ ভাবে, তার জন্যই এই আলগা গাম্ভীর্য। এই শ্রেণীর ক্রেতার বাছাই দেখাও একটা মজার ব্যাপার। নানারকম মোটামুটি ফালতু জিনিসে ভরা আড়ং থেকে বের হওয়ার সময় চোখ গেল ওখানকার গার্ডদের দিকে। বেচারারা বড় আশা করে থাকে কখন কেউ একটু ছোটখাট ভুল বা অনিয়ম করবে। তাহলে তারা একটু কথা বলার সুযোগ পায়। নইলে সারাদিন মুখে কুলুপ এটে কাঁচের দরজা টানা আর ইতস্তত ঘুরে বেড়ানো ছাড়া তাদের কিছু করার নেই। একজন ব্যাগ নিয়ে ঢুকে যাচ্ছিল দেখে তার দিকে প্রায় কয়েকজন গার্ড একসাথে প্রবল উৎসাহে এগিয়ে গেল। বেচারারা! পুরো তিনটা ফ্লোর প্রতিটা কোনায় কোনায় ঘোরা শেষ করে গেলাম পাঁচতলায় ফোনের দোকানে। এটাও বেশ ইন্টারেস্টিং জায়গা। সাধারণত যারা প্রায় কয়েকমাস ধরে জমিয়ে জমিয়ে হাজার দশেক টাকা কোনমতে জড় করে ফোন কেনার জন্য, তারাই এখানে ভীড় করে বেশী। দোকানের সবচেয়ে দামী ফোনগুলো নেড়েচেড়ে দেখে, একটু ইন্টারনেটে ঢোকে। তারা জানে যে ঐ ফোন সে আরও কয়েকবছরেও হয়ত কিনতে পারবে না কিন্তু কিছু টাকা জমিয়ে যে তারা ক্রেতা শ্রেণীর মধ্যে অন্তত ঢুকেছে সেই কারনেই ফোনগুলো ধরে দেখতে তাদের খুব ভাল লাগে। কেউ কোন ফোন গিয়ে ধরলেই দোকানের বিক্রয়কর্মীরা তাদের পাশে বা পিছনে গিয়ে নিঃশব্দে দাড়াচ্ছে। যতটা না সাহায্য করা বা তথ্য দেবার গরজ তার থেকে বেশী ফোনটা কে কীভাবে ধরছে, কিছু করে ফেলছে কিনা ইত্যাদি নজরে রাখার জন্য। মানুষে মানুষে অবিশ্বাস দেখে সত্যিই বেশ কৌতুক লাগে। মলের অন্যতম দর্শনীয় বিষয় ছোট বাচ্চা। কেউ কেউ মাটিতে গড়াচ্ছে, কেউ মা-বাবার হাত ধরে ঝুলে পড়ছে, কেউ চলন্ত সিড়ির উলটো দিক দিয়ে নামা বা ওঠার চেষ্টা করছে, কেউ পিছল টাইলসে স্কী করার চেষ্টা করছে, কেউ বা চিৎকার করে প্রায় পুরো ফ্লোরের মনযোগ একাই কেড়ে নিচ্ছে। শেষ শ্রেণীর বাচ্চারা যে বড় হয়ে ফেসবুকে ফেম seeker সেলিব্রেটি হবে তাতে আর সন্দেহ নেই! উপরে গেলাম ফুড কোর্টে। একজায়গায় দেখি প্রচন্ড আলোর ঝলকানি আর উদ্দাম সুরে গান হচ্ছে। মানুষের ভীড়ও সেদিকে কম নয়। গেলাম এগিয়ে। গিয়ে দেখি এক খাবারের দোকান বিশাল এক স্ক্রিন বসিয়েছে উপরে। সেখানে হিন্দি সিনেমার গান দেখানো হচ্ছে আর নানারকম শক্তিশালী লাইট ফেলে কনসার্টের আমেজ দেওয়ার চেষ্টা চলছে। রকম দেখে মনে হল মানুষ খাবারের থেকে হিন্দি গানই বেশী করে গিলছে। এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছি। নানারকম খাবারের সুঘ্রাণ নাকে সুড়সুড়ি দিচ্ছে। আমার খিদেও লেগেছে একটু একটু। কার্ডে যে পরিমাণ টাকা আছে আমি অনায়াসে এখানকার যেকোন রেষ্টুরেন্টে ঢুকে যেকোন কিছু খেতে পারি। কিন্তু আমি তো আজ খেতে আসিনি, আমি এসেছি দেখতে। তাও হয়ত কোথাও ঢুকেই যেতাম, কিন্তু এক জায়গায় দেখি এক বয়স্ক ভদ্রলোক হাতে ফোনখানা নিয়ে এদিক সেদিক তাকাচ্ছেন। অনেককিছুই কিনেছেন দেখা গেল। আমাকে দেখে কেন জানি আমার দিকেই এগিয়ে এলেন।
“বাবা, আমার একটা ছবি তুলে দিতে পারবা? পিছনে যেন ঐ লাইটগুলো থাকে!”
বলে ফোনটা তুলে দিলেন আমার হাতে। কয়েক এঙ্গেলে দিলাম তার ছবি তুলে। ছবি দেখে তিনি মহাখুশী,
“বাহ্‌ সুন্দর এসেছে তো!”
ভদ্রলোককে নিজেতে মুগ্ধ করে আমিও আর দাড়ালাম না ওখানে। আগে যখন হাটতে বের হতাম তখন একটা নিয়ম থাকত, যদি পথে কারও সাথে আমার কোন কথাবার্তা হয়ে যায় তাহলে ঐ পথে বা ঐ এলাকায় ঘোরা তখনই শেষ। আজও বুঝলাম যমুনা থেকে বের হওয়ার সময় হয়ে গেছে। বের হয়ে এগিয়ে গেলাম বসুন্ধরা গেটের দিকে। অনেক পরিবার যমুনা থেকে বের হয়ে বাড়ির দিকে যাচ্ছে। হেটেও যাচ্ছে অনেকে। চোখে পড়ল এক মা আর তার বাচ্চা মেয়েটা রাস্তার পাশের খাবারের দোকান বা কার্টগুলোতে যাচ্ছে কিন্তু কিছুই কিনছে না। তারা এগিয়ে যাচ্ছে গেটের দিকে, আমারও আগ্রহ হল দেখার যে তারা অবশেষে কী খায়। অবশেষে মা থামল পিঠার দোকানে। মেয়েকে ডেকে বলল, “আয় ভাপা পিঠা খাই!” মেয়েটা হয়ত আইসক্রিম বা স্ন্যাকস্‌ই বেশী পছন্দ করত কিন্তু লক্ষী মেয়ের মত মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে গেল। দুইজনে ধোঁয়া ওঠা পিঠা খেতে লাগল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। কিন্তু আমার তো দাড়ালে চলবে না। এগিয়ে গেলাম আরও। রাস্তা পার হয়ে আরও বেশ খানিকটা দূর গুলশানের দিকে। কিন্তু একসময় তো ফিরতে হবেই। রাত তখন আটটা। জোর কদমে হাটতে শুরু করলাম। বসুন্ধরা গেটের কাছে পৌছে রাস্তা কেবল পার হয়েছি, হঠাৎ শুনি চলন্ত বাস থেকে চিৎকার। দেখলাম চলন্ত বাস থেকে একটা লোক লাফ দিয়ে নেমে গেল কিন্তু তার কলার ধরে একজন এবং সাথে আরও কয়েকজনও নেমে এল! চলন্ত বাস থেকে হেলপার চিৎকার করে বলতে বলতে গেল
“ভাই ছিনতাইকারী! ধরেন ধরেন!”
আসলে ছিনতাইকারী নয়, পকেটমার। মুহুর্তেই জটলা জমে গেল। এধরণের দৃশ্য সাধারণত খুব নিষ্ঠুর হয়। তবুও উঁকি দিলাম। দেখেই বোঝা যায় হিরোইনখোর। শরীরে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। কয়েকটা কিল, চড় থাপ্পড় চলল। কিন্তু লোকটার মধ্যে কোন আবেগ বা উত্তেজনা কিছুই নেই। বেশ শান্তভাবেই মার ঠেকিয়ে বলল,
“ভাইজান আমার কথাডা একবার শুনেন!”
জনতাঃ- রাখ তোর কথা। বাসে উঠলেই খালি দেখি ফোন নাই, টাকা নাই! আজ তোরে খাইছি!
জনতাঃ- ভাই পুলিশ ডেকে পুলিশে দিয়া দেন
জনতাঃ- কত্তবড় সাহস, আমার পকেটে হাত দেয়!
জনতাঃ- বের কর দেখি তোর পকেটে কী আছে!
পকেট থেকে বের হল কম দামী দুটো ফোন। আশ্চর্যের ব্যাপার হল জনগণ এরপর বেশ শান্ত হয়ে গেল। এধরণের ঘটনায় সাধারণত মার বেশ ভালই দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে সেটা হল না। লোকগুলোকে মনে মনে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বাসার দিকে এগুতে থাকলাম। এতক্ষনে খিদে বেশ ভালই চাগিয়ে উঠেছে বুঝতে পারছি। রাস্তার উপরেই কার্ট খুলে বসেছে একটা। নতুন আমদানি। বসুন্ধরার এমনিতেই চিকন রাস্তা, তারই একপাশ নিয়ে কার্ট সাজিয়েছে। মারলাম ঢুঁ সেখানে। হাতে গোনা কয়েকটা খাবার। আমি সুযোগ পেয়ে উপদেশ ঝাড়লাম, “কী মামা, আইটেম বাড়াও না ক্যান?” এমনকি কয়েকটা আইটেমের আইডিয়াও দিয়ে দিলাম! দোকানদার উৎসাহের সাথে বলতে থাকল তার কী কী পরিকল্পনা সামনে।
“হ মামা, পিছনে বসার জায়গা বানাইতাছি, এরপর খিচুড়ি পাইবেন, বিরিয়ানি পাইবেন। এখন বসি শুধু বিকালে, এরপর সারাদিনই থাকমু।”
কর্মঠ মানুষের উদ্দমকে সাপোর্ট দেওয়া দরকার। তাই খেলাম কিছু। আহামরি কিছু নয়, কিন্তু ছোট্ট ব্যাবসার এতবড় আশাটাকে কি ছোট করা ঠিক? অবশেষে সোয়া নয়টার দিকে বাসার দিকে আবার হাটা ধরলাম। প্রায় তিন ঘন্টা ধরে টানা হাটছি, কোন ক্লান্তি নেই। নীচে চলছে পা আর উপরে গুনগুণ করে বের হচ্ছে,
“যদি তারে নাই চিনি গো সে কি আমায় নেবে চিনে?
এই নব ফাল্গুনের দিনে- জানি নে জানি নে।”
আজ ফাল্গুন নয়, কিন্তু মনের কাছে তাতে কিছু কি যায় আসে? একদমই না।

৫ নভেম্বর, ২০১৩

কয়েকটুকরো ডায়েরীঃ



০৬ জানুয়ারী, ২০১০
......জীবন! কত বড় একটা সুযোগ! একবার গেল তো চিরকালই গেল, আর কখনোই তা আবার ফিরে পাবার সুযোগ নেই। যতই ধর্মগ্রন্থগুলো বলে থাকুক মৃত্যুর পরের অন্য জীবনের কথা, তা তো আর জীবন নয়! জীবন মানে স্মৃতি। আমি ভেবে পাইনা কোন মানুষ তার সারাজীবনের স্মৃতি নিয়ে কীভাবে স্বর্গ বা নরকে স্থির থাকতে পারে। সে স্বর্গ যত ভালই হোক, আনন্দদায়ক হোক মানুষ তার অতীতের কথা, প্রিয়মুখের কথা স্মরণ করবেই। এটা মানুষের মৌলিক একটা বৈশিষ্ট্য। তাহলে সে সুখ মিথ্যা। আর যদি ধরে নেয়া হয় যে তখন মানুষের পৃথিবীর সব স্মৃতি মুছে দেয়া হবে তাহলে আর আমার আমিত্ব কোথায় থাকল? আমার সম্পূর্ণ স্বরূপের কেন্দ্রবিন্দুই তো হল আমার স্মৃতি। এটি নেই তো অন্য অনেক মানুষের সাথে আমার পার্থক্যও নেই। ফলে মৃত্যুর পর শান্তি পাব এমন কোন সুখচিন্তাও আমাকে শান্তি দেয় না। মৃত্যুকে আমি দেখি সকল অস্তিত্বের একটি সমাপ্তি রূপে। তারপর কী, বা আদৌ বা কিছু থাকা সম্ভব কিনা তা আমি জানি না, জানা সম্ভবও না। তবে এটা নিশ্চিত যে তা প্রচলিত ধর্মবিশ্বাসগুলোকে সমর্থন করবে না।
লেখায় বাধা পড়ল। (....) ফোন দিয়েছিল। প্রায় বিশ মিনিট কথা বললাম। মানুষ কত সহজ, সাধারণ হতে পারে। নিশ্চয়ই তাদের প্রতি মুহুর্তে চিন্তার ঝড় মোকাবেলা করতে হয় না। কেন তাহলে এত ধরনের চিন্তা আমার মাথায় আসে? কেন এই পৃথিবীর ব্যাবস্থাকে, মানুষের জীবন ব্যাবস্থাকে আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারি না? এত জ্ঞান, এত স্মৃতি, এত আবেগ, এত কিছু তবু কী সীমিতই তার ব্যাপ্তিকাল! জীবনটাকে পুরো বুঝে উঠতে না উঠতেই যদি তা শেষ হয়ে যায়, তার কি কোন অর্থ হয়? কোনই অর্থ হয় না।
১৭ই ফেব্রুয়ারী, ২০১০
অনেক পছন্দ করে ডায়েরীখানা কিনেছিলাম নিজের সুখ-দুঃখের কথাগুলো লিখে রাখব বলে। যাতে অনেকদিন পরে জীবনটাকে একবার ফিরে দেখতে গিয়ে অনুভূতিগুলো বুঝতে অসুবিধা না হয়। তবে মনে হচ্ছে এই ডায়েরীতে আমি আনন্দের, সুখের, শান্তির কোন Event এর কথা লিখতে পারব না। দিনগুলো সব একইরকম নিরানন্দ, একঘেয়ে এবং আশঙ্কায় পরিপূর্ণ। আজ বের হয়েছিলাম সকালে। কল করে সেতু, নাইম, বিষাণ ও শোভনকে ডাকলাম। কাল রাতের সামান্য ঝড়-বৃষ্টির পর এখনও আকাশ পরিষ্কার হয়নি। আমি সাইবার ক্যাফেতে বসে কাজ করছিলাম। ওরা যখন এল ততক্ষণে আবার বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। বিষাণ, শোভন আগেই এসেছিল, সেতু আর নাইম এল ভিজতে ভিজতে। ওরা কত প্রাণবন্ত, কত উচ্ছল, কত tension free! কত সহজে ওরা মজা করতে পারে, মজা পেতে পারে। জীবনের উপর কালো অন্ধকার মেঘ স্থির হয়ে নেই ওদের কারোর। কারেন্ট চলে গেল, আমরা পাঁচজন বাইরে এসে দাঁড়ালাম। ঝিরঝিরে বৃষ্টি হচ্ছে। হালকা বাতাস। আমার অসম্ভব প্রিয় আবহাওয়া। কিন্তু আমি উপভোগ করতে পারছি না। কিছুই যেন শান্তি দিচ্ছে না। আমার প্রিয় বন্ধুরা পাশে রয়েছে, এত সুন্দর আবহাওয়া তবু এক মুহূর্তও ওখানে থাকতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। এক ছুটে গিয়ে হারিয়ে যেতে ইচ্ছা করছিল কোথাও, কোন নির্জন নিভৃত কোণে।
২১ এপ্রিল, ২০১০
প্রস্তাবনাঃ
মানুষ ডায়েরী লেখে কেন? প্রশ্নটা আপাতভাবে খুব সরল হলেও উত্তরটা কিছুটা কঠিন। কারণ ডায়েরী মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিচ্ছবি। ফলে ডায়েরী লেখার পেছনে একেকজনের একেকরকম মনস্তত্ব কাজ করে। তবে এটা ঠিক ডায়েরী সম্পর্কে কিছুটা গোপনীয়তা সবাই চায়। আমিও চাই। এই ডায়েরীতে আমি চেষ্টা করব যতটা সম্ভব নিজের কাছে পরিষ্কার থেকে নিজেকে তুলে ধরতে। যাতে বহুদিন পরে যদি কোন এক ফাঁকে ডায়েরীখানায় আঙুল বুলাই তাহলে নিজের এই সময়টাতে ফিরে আসতে পারি। সেই অনাগত আমার উদ্দেশ্যেই ডায়েরীখানা হওয়ার কথা ছিল। তবে কি, আমি যখন যাই লিখি না কেন কোন এক অজানা পাঠককে কল্পনা করেই লিখি। যখন ডায়েরী লিখি তখনও মনে হয় আমি ছাড়াও হয়তো কোন একদিন কেউ লেখাটা পড়বে। ফলে নিজের অজান্তেই লেখাটা তার জন্যই হয়ে যায়। এই ডায়েরীখানা আমি খুব শখ করে কিনেছিলাম, তাই স্বভাবতই আমি চাইব এর প্রতিটি পাতাই আমার কাজে লাগুক। তাই এখন থেকে লেখাগুলো হবে পরপর, তারিখ অনুযায়ী পৃষ্ঠায় নয়। আর এখন পর্যন্ত মাঝে যে ফাঁকা জায়গাগুলো আছে সেটা ভরাট করা হবে “স্বপ্নজগৎ” দিয়ে। এখানে ঠাই পাবে আমার রাতের বেলার সেইসব স্বপ্ন যা যথেষ্ট পরিষ্কার ও মনের উপর প্রভাববিস্তারী।
তবে একটা কথা, স্বপ্ন নিতান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার। এমনিতেই এর বেশিরভাগ অংশই তেমন মনে থাকে না, তারপর আবার এমনভাবে সব দেখা যায় এবং এমনকিছু দেখা যায় যা বর্ননা করে কাউকে বোঝানো খুবই কঠিন। সেক্ষেত্রে পরবর্তীতে কেউ যদি কোনদিন এই ডায়েরী পড়েও, তাহলে বেশি একটা সুবিধা করতে পারবে না। তবে আশার কথা স্মৃতিগুলি যেহেতু আমার, তাই বর্ননা পড়ে হয়ত বহুদিন পরে আবার মনে করতে পারব। সামান্য হলেও, একটা ভয় কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। যেসব স্বপ্নের কথা আমি ভুলে যেতে চাই, সেগুলোকে লিপিবদ্ধ করে বাঁচিয়ে রাখা ঠিক হবে কিনা বুঝতে পারছি না।

৫ই জানুয়ারী, ২০১১
বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য কী? কেন মানুষকে বেঁচে থাকতে হয়? মানুষ নিজেকে খুব ভালবাসে বলেই কি জীবনকে হারাতে এত ভয়? হ্যাঁ জানি জীবন অনেক বড় একটা সুযোগ, একে একবার হারালে পাওয়ার আর কোন উপায়ই থাকে না, কিন্তু মানুষ জন্মায় কেন? প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার বাইরে মানুষের জন্মের কি আলাদা কোন সার্থকতা থাকা সম্ভব? কেননা জন্মস্থানের সাথে সাথে কী বিস্তর ফারাকই না তৈরি হচ্ছে জীবনধারায়। কোথায় যান্ত্রিক শহরের কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে হৈ হুল্লোড় করে করে বেড়ানো ফ্যাশনে ডুবে থাকা আর হাজারটা রিলেশনের জালে জড়িয়ে থাকা তরুণ আর কোথায় সমুদ্র ও পাহাড়ের গা ঘেঁষে গড়ে ওঠা জনপদের কোন আদিবাসী তরুণ, যে হয়তো প্রায় শূন্যের কাছাকাছি বসে পুরো দিগন্তটাকে চোখের সামনে নিয়ে লক্ষ বছরের পুরোনো কোন পাথরে ঠেস দিয়ে একমনে হাড়ের বাঁশি বাজায়। তাদের দুইজনের চিন্তাধারা কি কখনও এক হবে? তাহলে তাদের জন্য সার্থকতা কে নির্ধারন করে দেবে? আসলে আমার মতে পৃথিবীতে যতগুলো মানুষ, ঠিক ততগুলোই সার্থকতা। আমরা শুধু সমাজের ঠিক করে দেওয়া সার্থক মানুষগুলোকে অনুকরণ করতে করতে নিজেদের সার্থকতা খুঁজি। কিন্তু যাদের আমরা সার্থক বলে ধরে নিই, তারা নিজেরা কি তাদের নিজেদের জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট বা তাঁদের জীবনধারাই কি সবার জন্য অনুকরণীয়? মানুষকে ব্যক্তিক দৃষ্টিতে দেখা উচিৎ, সামষ্টিকভাবে নয়। কোন মানুষের কোন অবস্থাকেই ব্যক্তি নিজে ছাড়া সফল-অসফলের নিরিখে অন্য কারও বিচার করতে পারা উচিৎ নয়। আমরা আসলে খুব সহজে সাধারণীকরণ করে ফেলি মানুষকে। আমার কথাই ধরা যাক, আমি যে আপাত দৃষ্টিতে সমাজের চোখে ব্যার্থ একটা ছেলে, এটি কে নির্ধারন করেছে? সমাজ। সমাজ যদি নির্ধারন করে না দিত তাহলে ব্যক্তিগত জীবনে আমি এত সহজে এই অবস্থাকে ব্যার্থতা বলে মেনে নিতাম? সমাজকে এই নির্ধারন করে দেওয়ার দায়িত্ব থেকে সরে আসতে হবে। মানুষকে বিচার করার মত পূর্ণাঙ্গতা এখনও সমাজ পায়নি এবং সমাজের এই বিচার না করতে যাওয়াটাই শ্রেয়। আসলে সবার জীবনটাকে একই নিয়মের মধ্যে ফেলতে চাওয়ার সমাজের যে ব্যবস্থা, তা মানুষের ক্ষুদ্র জীবনটাকে খুব দ্রুত এবং আগে থেকেই জানা উপায়েপার করিয়ে দিচ্ছে। বেশিরভাগ মানুষ এটা বুঝতেও পারে না আর এটাকেই স্বাভাবিক বলে ধরে নিয়েছে। ভাল লাগে না কিছুই। নানারকম চিন্তা মাথায় যায় আসে, তাতে লাভ হয়না কিছুই। সময়গুলো যে কত দ্রুত পার হয়ে যাচ্ছে তা নিজেই অবাক হয়ে দেখছি। একইভাবে রোজ ঘুম থেকে উঠছি, চোখের পলকে দিনটা পার হয়ে যাচ্ছে আর নিজেকে ফিরে পাচ্ছি বিছানায়। করার আছে অনেক অনেক কিছু তবু সারাদিন-রাত কোনকিছুই আমি করতে পারি না। কী অসহ্য!

৩০ অক্টোবর, ২০১৩

বাঁচা

অন্য কোনখানে নয়, এই পৃথিবীতে-
সকল আহ্লাদ স্বাদ, জীবনের সব প্রয়োজন
যদি চাই পূর্ণ করে নিতে,
সময় কোথায় তার?
যদি হয় শুধু বসে মিছে আয়োজন,
বয়ে চলে অবিরত জীবনের ভার!

যে জোনাকি জ্বলে-নেভে, নিভে যায়
নিকষ আঁধারের বুকে
যে কুকুর অনাহারে, ধুলোর বিছানা 'পরে
মরে ধুঁকে ধুঁকে,
যে পাখি ঝাপটে ডানা খাঁচা ভেঙে উড়ে যেতে চায়
তফাৎ কোথায় তার সাথে এই মানুষের মতন বাঁচায়?

দুই পায়ে চলা পশু
দুই হাতে ভাঙতে গিয়ে জীবনের খাঁচা
পঙ্গু হয়ে নির্জীব পড়ে রয় একা।
অনন্ত আকাশখানি হয়না তো দেখা।
নিজেরে প্রবোধ দেয়, এই হল মানুষের মত হয়ে বাঁচা!



(২০১২)

২৬ আগস্ট, ২০১৩

ব্যর্থ পূর্ণিমা

আমি বহুদিন ধরে,
বুকের জমাট দুঃখ পাজরের ভেতরে লুকিয়ে রেখে
বসে আছি বড় আশা করে।
কোন এক পূর্ণিমার রাতে,
হবে হয়তো এমনই এক চাঁদময় রাতে
আমার সকল কান্না শুষে নেবে মায়াবী আঁধার
জমে থাকা কষ্ট সব গলে গিয়ে মিশে যাবে আর
ভেসে যাবে কোমল সে আলোকের স্রোতে!

প্রতিমাসে একবার,
সন্ধ্যার আকাশে চেয়ে খুঁজে ফিরি
উঠল কিনা দুঃখহারী হাসিমাখা চাঁদ।
কত মাস কেটে যায়,
ছোট চাঁদ বড় হয়ে ফের ছোট হয়!
নরম রূপার চাঁদ আলোর অশ্রু ঢেলে হাহাকার করে
বলে ওঠে, "কাঁদ, তুই কাঁদ!"

২৪ আগস্ট, ২০১৩

কেমন আছ তুমি?


কেমন আছ তুমি?
এতদিন পরে,
চোখ রেখে চোখের উপরে
মৃদুস্বরে, ভালবাসা-আবেগ লুকিয়ে
যদি রাখি প্রশ্ন তবে তার
কী জবাব দেবে তুমি, শুনতে বড় ইচ্ছা হয় আমার
 
হয়তো তোমার মুখে আছে এক বিষণ্ণ ছায়া
হয়তো ঠোটের কোণে লেগে থাকা
আধো হাসিখানি
বুঝিয়ে বলছে কোন অভিমানী মায়া
হয়তো গভীর বিশ্বাস নয়,
নয় নিয়ে অহেতুক ভয়, এইপানে
পাথরের চোখে তুমি চাইবে যেন
আমি নেই তুমি নেই কেউ কোনখানে
আরও কত কী যে হতে পারে কতভাবে
আমি তার কতটুকু জানি!
 
যে তোমাকে চিনতাম, তার কিছু আজও আছে বেঁচে
বাকি সব ভেঙেচুরে, কোথায় লুকিয়ে পড়ে
কবে গেছে মুছে!
অজস্র ঝড়ের ভিড়ে, ভালবাসা খুঁজে ফিরে
সব নয়, চেয়েছিলে শুধু দুটি হাত
কোথায় ছিলাম আমি, কোথায় ছিলে তুমি
কেটে গেল এতগুলো রাত!
তোমার চোখে কি ভেসে উঠবে সেই ঝড়ের আভাস?
যদি ওঠে, ভুলে যাব সব কথকতা
নির্লজ্জ এই মনে
প্রশ্ন হয়ে জেগে রবে একটিমাত্র কথা
"
কেমন আছ তুমি?"

২৪ মে, ২০১১

সে(প্রথম অংশ):-প্রখর সূর্যালোকে

নামলই পথে এতদিন পরে সে
পিছনে ফিরে তাকায়নি একবারও
সাফল্য(?) তার হাতে বাঁধা ছিল সত্যিই
কিন্তু পথের টান, তার চেয়ে ছিল অনেকখানি বড়।
শান্তির খোঁজে তৃষ্ণা মেটাতে পথে নামা অবশেষে
হয়ত পাবে, কিংবা পাবে না কিছুই তবু
এসব চিন্তা ভাবেনি কখনও সে।

ঠিক করে দেওয়া বেঁধে দেওয়া শান্তিতে,
অন্যের মত তৃষ্ণা মেটেনি তার।
চোখ কান বুজে ছুটতে ছুটতে হঠাৎ মনে এল
কোথায় শান্তি? কেমন তার আকার?
মিছে হয়ে গেল সব ছোটাছুটি, তুচ্ছ করে ছক
নির্ভার হয়ে সময়ের হাতে তুলে দিল সবকিছু।

বেরিয়ে পড়েই হয়ে গেল দিশেহারা
অগণিত পথ শত শত পথে গিয়ে,
পৌছেছে সব কোথায়, কে তা জানে!
চিন্তার জালে মাথা হয়ে আসে ভার।
সদা ব্যাস্ত যান্ত্রিক এ নগরে
পথ দেখানোর কেউ নেই কোনখানে,
পা বাড়াতেই দ্বিধা ঘিরে আসে তার।
সরল জীবন জটিল হয়ে আসে।

মাথা তুলে শূণ্য আকাশ মাঝে
খোঁজে সে হয়ত দৈব অভয়বাণী
বিষে বিষময় কালোধোঁয়া ভেদ করে
দেখা যায় শুধু ঘন কালো মেঘ, আর-
তারে দোল খাওয়া অজস্র কালো কাক
বুঝতে পারে সে উপরে কিংবা নীচে
ওরাই শুধু তাকিয়ে তার দিকে।
আতঙ্কে সাদা হয়ে যায় মুখখানি

ওর পাশ দিয়ে খুড়িয়ে খুড়িয়ে
হেঁটে যায় এক রুগ্ন কুকুর,
ভয়ার্ত চোখে তাকায় ওর দিকে।
নিজের মাঝে হঠাৎ তাকিয়ে বিহ্বল হয়ে সে,
চমকে দেখে ভয়ে কুকড়ানো মন-
একটু আশা আর অসীম ভয় নিয়ে,
কুকুরের মত তাকিয়ে একভাবে।

দুশ্চিন্তার কালো মেঘ জড় হয়ে,
ঝড় বুঝি ওই উঠল সত্ত্বা জুড়ে
বাইরেও যেন অশান্ত চারপাশে
ছুটছে মানুষ কোন সহজাত ভয়ে।
ঝড়ের দাপটে মেঘগুলো সরে গিয়ে,
প্রখর সূর্য মধ্য আকাশে বসে,
পুড়িয়ে দেয়ার নব অভিযানে নামে।

মাথার উপর জ্বলন্ত কড়া রোদে
মরিচীকা যেন জলে ঝিলমিল করে-
পিপাসার্ত ক্লান্ত তাকে প্রলোভন দিয়ে ডাকে
ঝাঁঝালো রোদের গুমোট গরমে ঘোর লাগা ওই মনে,
এগিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা আবার জাগে।
পিপাসার জল যে করেই হোক পেতেই হবে তাকে
চলতে রাজি সে, যতদিন তাতে লাগে।